Location: Ranaghat Posted on: 4/11/2026 4:31:57 AM

সোঁদা মাটির গন্ধ
কাল রাতের প্রলয়ঙ্করী তাণ্ডবের পর সকালটা যে এতটা শান্ত, এতটা মায়াবী হবে, সেটা ভাবা যায়নি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে ইজিচেয়ারটায় গা এলিয়ে বারান্দায় বসতেই অতনুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে ছ্যাঁত করে উঠল। চারপাশটা বড্ড বেশি শান্ত... যেন দমবন্ধ করা এক হিমশীতল নীরবতা।
তবে ওই অস্বস্তিটা নিমেষেই কেটে গেল ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায়। কাল রাতের কালবৈশাখীর রূপ রীতিমতো ভয় ধরানো ছিল। জানলার কাঁচগুলো যেভাবে কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু এখন চারদিক যেন সদ্য স্নান সেরে ওঠা এক স্নিগ্ধ রূপকথার মতো। আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে এখন ঝকঝকে নীল। উঠানের পুরনো পেয়ারা আর আম গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে রাতের জমানো বৃষ্টির জল। রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটার একটা বড় ডাল ভেঙে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা লাল ফুলগুলো যেন একটা নরম লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে মোহময় লাগছে বাতাসটাকে। মাটি থেকে উঠে আসা সেই পরিচিত, নেশা ধরানো সোঁদা গন্ধটা অতনুর বড্ড প্রিয়। চোখ বুজে বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিল সে।
"এই নাও, তোমার কড়া করে আদা দেওয়া চা।"
পিছন ফিরে তাকাতেই অতনু দেখল রিনি দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সেই হালকা নীল রঙের তাঁতের শাড়িটা, স্নান সেরে এসেছে বোধহয়, ভিজে চুল থেকে তখনও জলের ফোঁটা ঝরছে। রিনির মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি।
অতনু চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল, "কাল রাতে যা বাজ পড়ছিল না! আমি তো ভাবলাম আমাদের এই মান্ধাতা আমলের বাড়ির ছাদটাই বুঝি উড়ে যাবে। আর তুমি কিনা ওরম ঝড়ের মধ্যেও অঘোরে ঘুমোচ্ছিলে? সত্যি, তোমার ঘুমের তারিফ করতে হয় গিন্নি!"
রিনি ঠোঁট উল্টে বলল, "অঘোরে আমি ঘুমোচ্ছিলাম? বাজে বকবে না একদম। তুমিই তো নাক ডাকিয়ে বাড়ি মাথায় করছিলে। আমি তো ভয়ে দু'চোখ এক করতে পারিনি, সারা রাত জেগে বসেছিলাম।"
"হ্যাঁ, তা তো বলবেই!" অতনু হেসে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিল। "আহ! চা-টা আজ কিন্তু একেবারে অমৃত বানিয়েছ রিনি। কালকের ওই ভয়াবহ রাতের পর এই সকালের চা আর এই ব্যালকনি... জাস্ট স্বর্গ!"
রিনি কোনো উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে ওই একই রকমভাবে হাসতে লাগল।
হঠাৎ সদর দরজার নিচ দিয়ে খবরের কাগজটা স্লাইড করে ভেতরে ঢুকে এল। হকার ছেলেটা রোজকার মতোই দিয়ে গেছে। অতনু আড়মোড়া ভেঙে উঠে গিয়ে কাগজটা তুলে নিল।
আবার ইজিচেয়ারে এসে বসে কাগজটা খুলতেই প্রথম পাতার একদম ওপরের দিকের বড় হেডলাইনটায় চোখ পড়ল তার।
**"মাঝরাতের কালবৈশাখীতে তছনছ কলকাতা। বাজ পড়ে এবং শতবর্ষী পুরনো বাড়ির ছাদ ধসে মর্মান্তিক মৃত্যু একই পরিবারের দুজনের।"**
খবরটার ঠিক নিচেই একটা বড় সাদা-কালো ছবি দেওয়া। একটা পুরনো দোতলা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। ইঁট, কাঠ, আর ভাঙা পিলারের পাহাড় জমে আছে। পুলিশের লোক, দমকল আর পাড়ার লোকজন ভিড় করে আছে সেখানে।
অতনু চুকচুক করে উঠল। "আহা রে! বেচারা। কালকের ঝড়ে কার যে কী ক্ষতি হয়েছে কে জানে।"
কিন্তু ছবিটার দিকে আরেকটু মন দিয়ে তাকাতেই অতনুর বুকের রক্ত যেন জল হয়ে গেল। হাত দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল তার। ছবিটার বাড়ির নম্বর আর আধভাঙা নেমপ্লেটটা খুব চেনা লাগছে না?
'৪৬/২, চ্যা... ভিলা'।
এটা তো তারই বাড়ি! চ্যাটার্জি ভিলা!
ঢোক গিলে, কাঁপা কাঁপা চোখে অতনু খবরের ভেতরের অংশটা পড়তে শুরু করল—
*"গতকাল রাত ২টো নাগাদ ভয়াবহ বজ্রপাতে ছাদ ধসে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় অতনু চ্যাটার্জি ও তাঁর স্ত্রী রিনি চ্যাটার্জির। আজ ভোরে দমকল বাহিনী এসে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বামী-স্ত্রীর থেঁতলে যাওয়া মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘুমন্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে ওই দম্পতির..."*
অতনুর অবশ হাত থেকে খবরের কাগজটা মাটিতে খসে পড়ল। চারপাশের সেই সুন্দর সকাল, পাখির ডাক, চা—সব যেন এক লহমায় মুছে গিয়ে কানের কাছে ভোঁ ভোঁ একটা শব্দ হতে শুরু করল। সে ধীরগতিতে, ঘাড় ঘুরিয়ে রিনির দিকে তাকাল।
রিনি আর জানলার দিকে তাকিয়ে নেই। সে এখন সোজা অতনুর দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার মুখের সেই প্রশান্তির হাসিটা এখন চওড়া হতে হতে কানের দুই প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলেছে। অতনু খেয়াল করল, রিনির ভিজে চুল থেকে যে জলের ফোঁটাগুলো পড়ছিল, সেগুলো আসলে জল নয়, কালচে লাল রক্ত। রিনির মাথার পিছন দিকটা পুরোপুরি থেঁতলে ভেতরে ঢুকে গেছে, আর সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে ঘিলু মেশানো রক্ত।
অতনু আতঙ্কে একটা আর্তনাদ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পালাতে চাইল, কিন্তু পারল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার নিজের পা দুটো কংক্রিটের একটা ভারী পিলারের নিচে চাপা পড়ে একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। নিজের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে ছড়িয়ে আছে মেঝেতে।
চারপাশের সেই স্নিগ্ধ সকালের আলো, ওই নীল আকাশ, পাখির ডাক—নিমেষের মধ্যে সব জাদুর মতো মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিল এক কনকনে ঠান্ডা, গাঢ় অন্ধকার।
আর সেই মিষ্টি সোঁদা মাটির গন্ধটা উধাও হয়ে গিয়ে সারা ঘরে তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ল জমাট বাঁধা কাঁচা রক্ত আর পচা মাংসের উৎকট, বমি-আনা দুর্গন্ধ।
লেখা: চিত্র-গুপ্ত